January 16, 2026 5:36 am
January 16, 2026 5:36 am
আওয়াজ বাংলা / জনতার কথা / “বাংলার মানুষের কন্ঠ শুনবার চাই “

“বাংলার মানুষের কন্ঠ শুনবার চাই “

“কী চাও তুমি?”

“আমার কণ্ঠস্বর ফিরে পেতে চাই।”

এই একটি বাক্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার মানুষের শত বছরের বঞ্চনার ইতিহাস। রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্র যখন জনগণের কণ্ঠরোধ করে, তখন ইতিহাসের পাতায় জন্ম নেয় বিদ্রোহ, সৃষ্টি হয় আন্দোলন। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের কণ্ঠ—যে কণ্ঠ মুক্তিযুদ্ধের গান গেয়েছে, ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, আবার অন্যায়ের প্রতিবাদে পথে নেমেছে। সেই কণ্ঠস্বর আজ অবরুদ্ধ, উপহাসিত, কেমন যেন নিঃশব্দ! তাই আজ সময় এসেছে আবার বলতে, জোর গলায় বলতে—“বাংলার মানুষের কণ্ঠ শুনবার চাই।”

বাংলার মানুষের কণ্ঠস্বরের ইতিহাস মানেই এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। যেখানে প্রত্যেকটি অধ্যায়ে রক্ত, চোখের জল আর নিরন্তর স্বপ্ন লিপিবদ্ধ।

একটা জাতির মেরুদণ্ড তার ভাষা। পাকিস্তানি শাসকেরা বাংলা ভাষাকে দমন করতে চেয়েছিল, আর তাতেই জেগে উঠেছিল বাংলার কণ্ঠস্বর। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার তাদের প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন—কণ্ঠস্বর থামিয়ে রাখা যায় না। তাদের মৃত্যুই হয়ে উঠেছিল বাঙালির কণ্ঠে শুদ্ধ উচ্চারণের সূচনা।

বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামও ছিল এক দীর্ঘ “কণ্ঠের যুদ্ধ”। “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো”—বঙ্গবন্ধুর সেই কণ্ঠ ছিল মুক্তিযুদ্ধের দামামা। গানের মধ্যে, কবিতার মধ্যে, আবৃত্তির মধ্যে, আর সবচেয়ে বড় কথা, জনতার গর্জনে—সেই কণ্ঠ বিশ্বকে শুনিয়ে দিয়েছিল: “বাংলা বাঁচবে, বাংলাদেশ হবে।”

স্বাধীনতার পর অনেকেই ভেবেছিল, এখন আর কণ্ঠস্বর দমন হবে না। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। ক্ষমতার পালাবদলে, রাজনৈতিক সুবিধাবাদের লড়াইয়ে, জনগণের সেই প্রাণভোমরা কণ্ঠস্বর বারবার বন্দী হয়েছে।

প্রতিবছর অসংখ্য সাংবাদিককে হত্যার শিকার হতে হয়। কলম বন্ধ করার হুমকি, সংবাদপত্রের লাইসেন্স বাতিল, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ—সবই প্রমাণ করে যে, মানুষ তার মন খুলে বলার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে।

যেখানে মানুষ একটু খোলামেলা কথা বলত, সেই ফেসবুক-টুইটার-ইউটিউবেও শুরু হয়েছে নজরদারি, মামলা, গ্রেফতার। কেউ একটু সমালোচনা করলেই জেল, কেউ সত্য বললেই ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’। অথচ গণতন্ত্রে ভিন্নমতই তো সৌন্দর্য!

আমরা অনেক সময় শহরের কণ্ঠস্বরকেই ‘মানুষের কণ্ঠ’ মনে করি। কিন্তু একবার ভেবে দেখো—সেই গ্রামীণ কৃষকের কথা, যিনি সারাদিন মাঠে কাজ করে মজুরি না পেয়ে মুখ নিচু করে বাড়ি ফেরেন; সেই মা, যার সন্তান ভুয়া মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলে, অথচ তিনি কাঁদতেও পারেন না।

কেউ শোনে না ওদের।

ওরা চিৎকার করতে জানে না,

তাই ওদের দুঃখকে বলা হয়—‘নিয়তি’।

কণ্ঠ দমন মানেই জাতিকে স্তব্ধ করা

মানুষের কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিলে সমাজে জন্ম নেয় নিঃশব্দ সন্ত্রাস। যখন কথা বলা যায় না, তখন জন্ম নেয় অন্যায়ের অভ্যস্ততা। প্রশ্ন না থাকলে জবাব থাকে না, প্রতিবাদ না থাকলে সঠিক পথ খুঁজে পাওয়া যায় না।

কণ্ঠস্বর মানেই প্রশ্ন।

প্রশ্ন মানেই উত্তরণের পথ।

বাংলাদেশের তরুণেরা সব সময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছে। ২০১৩ সালে শাহবাগ, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের কোটা-গণজাগরণ—সবই তরুণ কণ্ঠের জাগরণ।

তবে এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক তরুণ হতাশ, ভয় পায় কথা বলতে। পরিবার, সমাজ, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অনেক সময় মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই।

একটি ভয়ঙ্কর আত্মমুখী প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যারা আর কিছুতেই মুখ খুলে না। তারা গা ভাসায়। প্রশ্ন না করে স্রোতে ভেসে চলে।

আমরা কণ্ঠ বলতে বুঝি শুধু উচ্চারিত শব্দ। কিন্তু বাংলার মানুষের কণ্ঠ এসেছে বিভিন্ন মাধ্যমে:

কবিতার মধ্য দিয়ে (নাজিম হিকমত থেকে হেলাল হাফিজ পর্যন্ত)

গান দিয়ে (জলসাঘর থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)

চিত্রকলা দিয়ে (শিল্পী কামরুল হাসান)

নাটক দিয়ে (সেলিম আল দীনের নাটক)

এগুলো সবই কণ্ঠস্বর। আমরা সবসময় কেবল বক্তৃতাকারীদের কণ্ঠ শুনি, কিন্তু কবির, শিল্পীর, কৃষকের, শ্রমিকের, গার্মেন্টসকর্মীর কণ্ঠস্বর—এসব আমরা উপেক্ষা করি।

কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, যখন আমরা মানুষের কণ্ঠস্বর শুনিনি, তখন আমরা হারিয়েছি সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো—স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মানবতা।

একজন মানুষ যখন বলে,

“আমার কথা কেউ শোনে না”—

তখন সেই নীরবতা থেকেই জন্ম নেয় বিস্ফোরণ।

১. মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

২. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে।

৩. নির্বাচনে জনগণের সত্যিকারের মত প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে।

৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্ত চিন্তার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

৫. গ্রামগঞ্জের মানুষের কণ্ঠ পৌঁছে দিতে হবে শহরে, রাষ্ট্রে, বিশ্বে।

৬. তরুণদের ভাবতে ও প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে।

বাংলার মানুষ কেবল নিঃশ্বাস নিতে চায় না, তারা চায় উচ্চারণ করতে। তারা চায় তাদের দুঃখ-কষ্ট, স্বপ্ন-আশা, জিজ্ঞাসা-প্রেম—সবকিছু বলার অধিকার ফিরে পেতে। আর সেটাই সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র।

একটি জাতিকে চিনতে চাইলে তার মানুষের কণ্ঠস্বর শুনো।

বাংলার মানুষের কণ্ঠ শুনে বোঝা যাবে, আমরা কে, আমরা কী চাই।

তাই বলি—

কণ্ঠস্বর দমন নয়, কণ্ঠস্বর শ্রবণই হোক আমাদের আগামী পথচলার প্রধান নীতি।

বাংলার মানুষের কণ্ঠ শুনবার চাই—এটাই আজকের সবচেয়ে বড় দাবি।

নিজস্ব প্রতিবেদক

আওয়াজ বাংলা

মিরপুর, ঢাকা।