January 16, 2026 5:37 am
January 16, 2026 5:37 am
আওয়াজ বাংলা / জনতার কথা / জীবনের গল্প / নানির স্নেহছাঁয়ায় বেড়ে ওঠা – আমার জীবনের গল্প

নানির স্নেহছাঁয়ায় বেড়ে ওঠা – আমার জীবনের গল্প

আমি মো. হিমু। আজ ১৭ বছর বয়সে ফিরে তাকালে আমার পুরো জীবনটাই যেন একটি দৃঢ়, আবেগময় গল্প। ছোটবেলা থেকে আজ অবধি যাঁর হাত ধরে আমি সব বাধা অতিক্রম করে এখানে পৌঁছেছি, তিনি আমার নানি। তিনি শুধু একজন অভিভাবক নন—তিনি আমার জীবনের পথপ্রদর্শক, আমার প্রথম আশ্রয়, আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

 

আমার বাবা-মা জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকেন, আমি আর আমার ছোট বোন জন্মের পর থেকেই নানাবাড়িতে বড় হয়েছি। আমার বোন তো মাত্র ৯ মাস বয়সেই মায়ের কোলে থেকে নেমে পড়েছিল নানির কোলের আশ্রয়ে। তখন থেকেই আমাদের দু’জনের বেড়ে ওঠা শুরু হয়েছিল এই অভাবের সংসারে, কিন্তু ভালোবাসায় ভরপুর এক আশ্রয়ে।

 

আমার নানা-নানি ছিলেন সম্মিলিত পরিবারের অংশ। শুরুতে পরিবেশটা ছিল খুবই আপন। মামারা ভালোবাসতেন, যত্ন নিতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন মামাদের বিয়ে হয় এবং মামিরা আসেন, তখন ধীরে ধীরে পরিবেশে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। প্রথম কয়েক বছর সম্পর্ক ভালো থাকলেও পরে মামিরা আমাদেরকে বোঝা মনে করতে শুরু করেন। আমাদের উপস্থিতি নিয়ে অনেক কথা উঠত, যা নিয়ে নানির সাথে ঝগড়া লেগে যেত, অশান্তি হতো। এইসব পারিবারিক দ্বন্দ্বের মাঝে থেকেও নানি আমাদের আগলে রেখেছেন অক্লান্তভাবে। কখনো আমাদের পাশে থাকা থেকে পিছিয়ে যাননি।

 

নানির সংসার অভাবের হলেও ভালোবাসা ছিল প্রাচুর্যে। অনেক সময় তিনি নিজে না খেয়ে আমাদের খাইয়েছেন। তিনি কখনো পড়াশোনা শেখেননি, তবুও আমাদের শিক্ষার পেছনে তার যে অবদান, তা অনন্য। তিনি শুধু পড়াশোনার গুরুত্বই বোঝাননি, আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

 

এখানেই আমাদের শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা—পারিবারিক শিক্ষার।

 

নানির কাছ থেকেই আমরা শিখেছি জীবনের মৌলিক নীতিগুলো। কীভাবে অন্যকে শ্রদ্ধা করতে হয়, কিভাবে পরিবারের বড়দের কথা মানতে হয়, আর ছোটদের স্নেহ দিতে হয়—এসব আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন সত্য বলা, বিনয়ী থাকা, এবং অন্যের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানোর মতো মানবিক গুণাবলি। সম্মিলিত পরিবারের চাপে-সংকটে থেকেও তিনি যে ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা দেখিয়েছেন—সেটা আমাদের জীবনের পাঠশালা হয়ে উঠেছিল।

 

শুধু আচরণ নয়, নানির কাছ থেকে আমরা শিখেছি কিভাবে অভাবেও আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচা যায়। সংসারে অনেক সময় যখন আমরা অবহেলার শিকার হয়েছি, তখন তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে ঘৃণা নয়, বরং সহানুভূতি নিয়ে ভাবতে হয়। পারিবারিক শিক্ষার এই ভিত্তিই আজ আমাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলেছে।

 

বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং (মেকানিক্যাল টেকনোলজি) নিয়ে পড়াশোনা করছি। পড়াশোনার জন্য আমি এখন বাইরে আছি, নানির বাসা ছেড়ে এক নতুন জীবনের পথে হাঁটছি। তবে আমার ছোট বোন এখনো নানির কাছেই আছে, সে বর্তমানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। আমি জানি, আমার বোনও সেই একই ভালোবাসা আর যত্নে বেড়ে উঠছে, যেটা আমি পেয়েছিলাম।

 

খুশির বিষয় হলো, সময়ের সাথে সাথে মামিদের সাথেও সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝির জায়গাগুলো কমেছে, পরিবারে অনেকটা শান্তি ফিরে এসেছে।

 

আজ যখন আমি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছি, তখন মন থেকে একটাই কথা বলতে চাই—আমার জীবনের প্রতিটি অর্জনের কৃতিত্ব শুধুই আমার নানির। তিনি না থাকলে হয়তো আমি এতদূর আসতেই পারতাম না। তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ আর আদর্শের শিক্ষা আমাকে মানুষ করেছে।

এই প্রতিবেদন শুধু একটি জীবনকাহিনী নয়—এটি এক মহিয়সী নারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা, যিনি নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে আমাদের দু’ভাইবোনকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। তাঁর জীবনদর্শন এবং পারিবারিক শিক্ষার অনন্য আদর্শ আজো আমাদের পথ দেখায়।