নামটা ঠিক মনে নেই—ছেলেটা যে হোটেলে গ্লাসবয়ের কাজ করে, সেখানে আমার প্রতিদিনই দুই-তিনবার যাতায়াত । খাবার খুব উন্নতমানের নয়, মাঝারি মানের বলা চলে। তবে আমি সেখানে যাই শুধু খাবারের জন্য বিষয়টা এমন নয়—খাবারের চেয়েও বেশি টানে মানুষের সান্নিধ্য, গল্পের আড্ডা, এবং হৃদয়ের উষ্ণতা। নানা বিষয়ে কথা হয়, হাসি-আনন্দে মেতে থাকি। ওদের সবাইকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখি, স্নেহ করি। আসলে, আমি মানুষকে ভালোবাসি। কারো দুঃখ দেখলে তা নিজের ভেতর অনুভব করি। মানুষের দুঃখে দুঃখ পাওয়াটা যেন আমার একান্ত নিজস্ব সাধনা। তাদের দুঃখে; দুঃখী হতে মরিয়া হয়ে থাকি।
ছেলেটা আমাকে খুব শ্রদ্ধা করে। এক সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ‘ব্যথার দান’ চলচ্চিত্র দেখে সৈয়দ রিশাদ ভাইয়ের বাসায় ফেরার পথে হোটেলটায় ঢুকি। সেখানে এক ছোট ছেলের সঙ্গে গল্প জমে ওঠে, পরিচয়ও হয়। তার মাধ্যমে আরও দুজনের সঙ্গে কথা হলো—তারা একসঙ্গেই চলে। সবাই মিলে হালকা কিছু খেলাম। একে একে সবাইকে বিদায় জানালাম।
আমি নিজেও ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় দেখি গ্লাসবয় (ছেলেটা) একটা প্লেটে ঝালমুড়ি নিয়ে এসেছে। প্লেটে দুটো চামচ। বলল, “ভাইয়া, আপনি খাওয়া শুরু করেন।” জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি খাবা না?” উত্তর দিল, “খাব।” তখন সে হোটেলের প্লেট ধুচ্ছিল, আমি অপেক্ষা করলাম।
পরে আমরা একসাথে সেই ঝালমুড়ি খেলাম—একই প্লেট থেকে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কত টাকা বেতন পাও?” বলল, “দুইশ টাকা।” অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম—সকাল ৯টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করে মাত্র ২০০ টাকা! কল্পনারও বাইরে!
এক পাশে বসে থাকা একজন জানাল, “ভাই, ছেলেটাকে অনেক খাটায়। মনে হয়, সব কাজ ও একাই করে।” একজন কারিগর আছেন, যিনি ভাজাপোড়া বানান, মাঝে মাঝে খাবারও সার্ভ করেন। তাকেও দেখেছি ছেলেটার প্রতি স্নেহশীল। সে পায় ৭০০ টাকা, আর এই ছেলেটা পায় মাত্র ২০০ টাকা। অথচ সেই ২০০ টাকা থেকেই আমার জন্য ৩০ টাকার ঝালমুড়ি কিনে এনেছে! তার হৃদয়ের প্রশস্ততা কী অসীম!
এই ভালোবাসা, এই শ্রদ্ধা, জোর করে নেওয়া যায় না। এটা গড়ে ওঠে অন্তর থেকে—নির্মল, নিঃস্বার্থ। সবার পক্ষে এ ধরনের অনুভূতি ধারণ করা সম্ভব নয়। আমি অনেকবার চেয়েছি তাকে ঝালমুড়ির টাকাটা দিয়ে দিতে, কিন্তু সে অনড়—“আমি কষ্ট পাব, টাকা দিয়েন না।” আমি নিঃশব্দে উঠে আসছিলাম, এমন সময় আরেক ছোট ছেলে এগিয়ে এসে সালাম দিল, হাত বাড়িয়ে দিল (হাত মেলানোর জন্য। বয়স দশ বছর হবে। আগের রাতে তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। সে একটা মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপে কাজ করে, সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। বেতন পায় কি না, বলতে পারি না। আমি আলতোকরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
এদের কারো সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক নেই। তবু এক অদ্ভুত আত্মিক বন্ধন অনুভব করি। ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি, রঙ—সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষ মানুষের জন্য। এই সহজ, অথচ গভীর সত্যটা আমি প্রতিদিন অনুভব করি ওদের মাঝে। ভালোবাসা আসলে এতটাই সরল, আবার এতটাই শক্তিশালী।



