January 16, 2026 4:08 am
January 16, 2026 4:08 am
আওয়াজ বাংলা / আর্কাইভ / কৈশোরে আমি ও আমার উপলব্ধি

কৈশোরে আমি ও আমার উপলব্ধি

         কৈশোরে আমি ও আমার উপলব্ধি

                           

আমি কৈশরে পা দিয়েছি আগেই । কচি ডালপালার মতো বেড়ে উঠছি ধীরে ধীরে,নতুন চাহিদা,অনুভূতি আর প্রশ্নের সাথে।

আমার কৈশোরের প্রবেশ – একটি সময় যা কখনো ঝড়ের মতো উত্তাল, আবার কখনো বসন্তের মতো কোমল। কৈশর আমার কাছে মনে হয় একটি দেওয়াল,যার অপর প্রান্তে রয়েছে – আমার আসল পরিচয়,আমার চিন্তা-চেতনা, আমার আবেগ, আমার ভালোলাগা, আমার আমি। কৈশরে পা দেওয়া মাত্রই যেন নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক আশ্চর্য যাত্রা শুরু হল। একটা সময় ছিল, যখন আমি সারাবেলা কার্টুনে ডুবে থাকতাম,সারাবেলা খেলনা নিয়ে খেলতাম। কি করতাম, না করতাম- কোন কিছুরই কোন খোঁজ – খবর রাখতাম না। কিন্তু এখনকার দিনগুলো কেমন যেন! সব কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে! বারবার নিজেকে নতুন রূপে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা! একেই কি বলে কৈশর?

হ্যাঁ, একেই বলে কৈশর। এখন কার্টুন, খেলনা নিয়ে ভাবি না।

মাঝরাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি – আমি কে? কি করছি? কেন করছি? আমার ভবিষ্যৎ কি? কত শত প্রশ্ন!

নিজের ভেতরে পরিবর্তন টের পাচ্ছি । শরীর যেন এক অজানা ভাষায় কথা বলে উঠছে। মনের মাঝে হঠাৎ বৃষ্টি নামে, আবার কখনো রোদেলা হাসি ফুটে ওঠে। আগে যেসব ব্যাপার ছিল তুচ্ছ, সেগুলো এখন হয়ে ওঠেছে অর্থপূর্ণ। একটি বন্ধুর একটি কথা, কারো একটুখানি অবহেলা—সবই যেন হৃদয়কে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।

আমার উপলব্ধি হতে শুরু করে প্রথম নিজস্বতাকে নিয়ে। আগে যেটুকু চিন্তা ছিল কেবল “আমার পরিবার কী চায়”, এখন সেখানে স্থান পেল “আমি কী চাই?” এই পরিবর্তন আমার ভেতরের একটি বিপ্লবের মতো। আমি জানতে চেয়েছি আমার আগ্রহ, আমার স্বপ্ন, আমার সীমাবদ্ধতা। এই প্রশ্নগুলো যখন মাথার ভেতর দোলা দিতে শুরু করল, তখন বুঝলাম—এই আমিটিই আমার সবথেকে কাছের বন্ধু, আবার সবচেয়ে বড় রহস্য। তবে ছোটবেলায় আমি কিছুটা অন্যরকম ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমার নিজের প্রতি একটা অন্যরকম ভালোবাসা,আবেগ এবং আগ্রহ ছিল। আমার ছোটবেলাটা ছিল আরো বিচিত্র। তখন থেকেই আমি পরিকল্পনা করতে শুরু করেছিলাম, আমি কি করবো? কেন করব? কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি-না?

তখন অনেকের কথা ভাবতাম। এখনো ভাবি। কিন্তু নিজের প্রতি কেমন যেন একটা অন্যরকম ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। নিজের স্বপ্নগুলোকে পূরণ করার জন্য মনের গহীনে হাহাকার তৈরি হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ না হলে, আমি আর বাঁচবো না। একেই কি বলে কৈশোর জীবনের আবেগ! আবেগটা এখন অনেক বেশি।

কৈশোরে সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছি সম্পর্কের রং। বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বদলে গেছে। আর শুধু খেলাধুলার সাথী নয়, বন্ধু মানে এখন মন বোঝা, দুঃখ ভাগ করে নেওয়া, একসাথে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা। আবার এই সময়েই বুঝেছি—সব সম্পর্ক চিরস্থায়ী নয়। কিছু মানুষ আসে শিক্ষা দিতে, কিছু আসে সঙ্গে থাকতে। এই আসা-যাওয়ার মাঝেও আমি ধীরে ধীরে শিখেছি কাকে আঁকড়ে ধরা উচিত, কাকে নয়। এই কৈশোরে অনেক বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে;যারা স্বার্থলোভী । বারবার আমাকে ঠকিয়েছে! আমার আড়ালে আমারই বদনাম রচনা করেছে। আবার সামনাসামনি কথা বলে মনে হয়েছে, সে আমার সবচেয়ে আপন। তারা বারবার আমার সাথে প্রতারণা করেছে। কিন্তু তারপরেও আমি তাদেরকে ছেড়ে যেতে পারি না। বারবার মনে হয় তাদেরকে আর একটা সুযোগ দেওয়া দরকার। একবার, দুইবার,তিনবার; হাজার বার সুযোগ দিতে ইচ্ছা করে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে, ‘সে আর আমার সাথে প্রতারণা করবে না’। কিন্তু একই কাজ সে বারবার করে। তারপরেও তাকে বিশ্বাস করি। এই কি কৈশোরের ভালোবাসা, আবেগ? খুব সহজেই যে কাউকে বিশ্বাস করি; নিজের চরম শত্রুকেও।

সবচেয়ে জোরালো উপলব্ধি ছিল—নিজেকে বোঝা মানে পৃথিবীকে বোঝার শুরু। আমি বুঝেছি, আবেগ দুর্বলতা নয়, বরং অনুভব করার শক্তি। চোখের জল লুকিয়ে রাখার চেয়ে তা মেনে নেওয়াই বড় সাহস। আমি শিখেছি, ব্যর্থতা মানে শেষ নয়—এটা নতুনভাবে শুরু করার ডাক।

প্রযুক্তির হাত ধরে আমার চোখ খুলেছে দুনিয়ার দিকে। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া—সবই যেন এক নতুন জানালা, যেখানে আমি শুধু অন্যদের দেখি না, বরং নিজের প্রতিচ্ছবিও দেখি। কখনো এসব জায়গা আমাকে বিভ্রান্ত করেছে, আবার কখনো উদ্বুদ্ধ করেছে। এখানে আমি শিখেছি—তথ্যের ভিড়ে সত্যিকারের জ্ঞান কীভাবে খুঁজে নিতে হয়। সবকিছুর ভালো দিক যেমন আছে, খারাপ দিকও আছে। প্রযুক্তির খারাপ দিকগুলো যেন জোড়ালেভাবে আমাকে টানে। অনেক সময় মজে যাই পর্নোগ্রাফিতে। আবার পরক্ষণে মনে হয়, না! না! আমি ভুল করছি! আসলেই ভুল করছি। ভুলটা বুঝতেও পারছি। এতে আমার অনেক ক্ষতি হচ্ছে তাও বুঝতে পারছি। কিন্তু খারাপ দিকের ব্যবহার ছাড়তে পারছি না। আমার কৈশোরের এটাই কি ব্যর্থতা?

হ্যাঁ, হবে হয়তো!

পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় আপনজন মা-বাবা।

পরিবারকেও নতুন আলোয় দেখেছি এই সময়ে। বাবা-মায়ের উপদেশ, যেগুলো এক সময় কেবল ‘বাধা’ মনে হতো, এখন বুঝি, তা ছিল ভালোবাসার পরাকাষ্ঠা। তারা আমার নিরাপত্তার দেয়াল, আমার প্রথম শিক্ষাগুরু, আমার ছায়া। আজ তাদের চোখে আমি দেখতে পাই আশা, আর নিজের চোখে দেখতে পাই দায়িত্ব। মা- বাবার কথা আর বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না । মনে হয় তারা আমার জন্য অনেক করেছে। আমারও কিছু করা দরকার? কিন্তু কিছুই করতে পারিনা! এটাও কৈশোরের একটা ব্যর্থতা। তারপরেও তারা আমার প্রতি প্রচন্ড খুশি। তাদের ছেড়ে ঢাকাতে পড়াশোনার জন্য থাকি। প্রতিদিন তাদের কথা মনে পড়ে। এক মুহূর্তও তাদের ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করে না। বারবার নিজেকে অসহায় মনে হয়। একা একা মনের ভিতরে সারাদিন কাঁদি। কারণ আমি তাদের ভালবাসি। এই মনে হয় কৈশোরের সফলতা।

সব শেষে বলব, কৈশোর আমার জীবনের আয়নার মতো। এই আয়নায় আমি আমার হাসি, কান্না, ভুল, সংশয়, স্বপ্ন—সবকিছুর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। এটি এক যাত্রা, যেখানে আমি শুধু বেড়ে উঠিনি, বরং জেগে উঠেছি।

আমার উপলব্ধি আজও চলছে, কারণ কৈশোর শেষ হলেও, আমি নিজেকে খোঁজা থামাইনি। আর এই খোঁজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমার জীবনের সফলতা। কৈশোরে যেমন ব্যর্থতা রয়েছে তেমনি রয়েছে সফলতা। তবে ব্যর্থতার যে হয়তো সফলতাই বেশি।